অসম জাতীয় পরিষদের সম্পাদক চিত্তরঞ্জন বসুমতারীর সংবাদ সম্মেলন::
উজনি অসমে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত
প্ৰতিনিধি ডিব্রুগড়, ৮ এপ্রিলঃ
অসম জাতীয় পরিষদের এক সংবাদ সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক চিত্তরঞ্জন বসুমতারী বলেন যে, উজনি অসমের প্রায় ৪৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৮টিতে বিজেপি পরাজিত হবে।ডিব্রুগড়ের গদাপাণি এলাকায় দলের সভাপতির বাসভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অসম জাতীয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সম্পাদক চিত্তরঞ্জন বসুমতারী সরকারকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। সংবাদ সম্মেলনে দলের উপ-সভাপতি বীরেন বরুয়া, সম্পাদক ও মুখপাত্র জিয়াউর রহমান, সম্পাদক মানিক গগৈ এবং অসম চা শক্তির রাজ্যিক আহ্বায়ক ঘনশ্যাম সাহু উপস্থিত ছিলেন।এই সময় চিত্তরঞ্জন বসুমতারী স্পষ্টভাবে বলেন যে, এবারের নির্বাচনে জনগণ বিজেপির প্রলোভন ও দমনমূলক রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে মনস্থির করেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান সরকার একটি বিশেষ বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যাকে তিনি হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাহিনী বলে অভিহিত করেন। তাঁর কথায়, এই বাহিনী অসমে সিন্ডিকেট রাজ, লুণ্ঠন এবং বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।অসম জাতীয় পরিষদের এই নেতা বলেন যে, কংগ্রেস, এজেপি, রাইজৰ দল, সিপিআই(এম), সিপিআই (এমএল), এপিএইচএলচি এবং সোনোয়াল কছাৰী গণমঞ্চ-এর মতো দলগুলি এবার একজোট হয়েছে। এর ফলে বর্তমান শাসকদল ভীত হয়ে পড়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।বসুমতারী দাবি করেন যে, বিশেষ করে উজনি অসমের ৪৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ২৮টি আসনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত।তিনি আরও বলেন যে, ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে বড় পার্থক্য দেখা যায়। তাঁর মতে, ২০১৬ সালে বিজেপির ‘জাতি-মাটি-ভেটি’ স্লোগানে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছিল, আর ২০২১ সালে বিরোধী দলগুলি বিভক্ত থাকায় বিজেপির জয় সহজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শক্তি বিজেপিকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে বসুমতারী জনসাধারণকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘ন্যায়’ দাবি করার আহ্বান জানান।তিনি বলেন, বিজেপি অসম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা এখন আর বাস্তবায়িত হয়নি। এনআরসি হালনাগাদ এবং বিদেশি বিতাড়নের প্রতিশ্রুতিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘কা’ এর মতো জাতিধ্বংসী আইন চাপিয়ে দিয়ে অসমের উপর ৫৪ বছরের বিদেশির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।এর পাশাপাশি, ছয় জনগোষ্ঠীকে জনজাতিকরণের নামে গত ১২ বছর ধরে প্রতারিত করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।তিনি বলেন, দামবৃদ্ধির বোঝায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অসম ২৭তম এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ২৮তম স্থানে নেমে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বচ্ছ নিয়োগের নামে কেবল একটি বিশেষ কেন্দ্র—অর্থাৎ জালুকবাড়ি এলাকার যুবক-যুবতীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, জালুকবাড়ি কেন্দ্রে ৫৫ বছর বয়সী লোকেরাও চাকরি পাচ্ছে।তিনি বলেন, অসমে মোট সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। বিজেপির আমলে তা কমে প্রায় সাড়ে চার লক্ষে নেমে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, নতুন চাকরি সৃষ্টি না করে কেবল শূন্যপদ পূরণ করা হয়েছে।তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ৮,০০০টি অসমীয়া মাধ্যমের বিদ্যালয় বন্ধ করে সরকার জাতীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খাতকে ধ্বংস করেছে।মহিলা ভোটারদের উদ্দেশে বসুমতারী বলেন, সরকার ‘অৰুণোদয়’ এবং ‘লাখপতি বাইদেউ’ প্রকল্পের মাধ্যমে মায়েদের প্রলোভিত করছে এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা দেওয়ার নামে সরকারি সভায় জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ৯ জন মহিলার করুণ মৃত্যু হয়েছে এবং ১৮ জন মহিলা সভাস্থলেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবুও এই ঘটনাগুলি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।এর বিপরীতে তিনি ঘোষণা করেন যে, বিরোধী ঐক্য মঞ্চ ক্ষমতায় এলে কোনো সভা-সমিতিতে না গিয়েই মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে অৰুণোদয় প্রকল্পের অর্থ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি নাগরিককে ২৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।তিনি বলেন, মন্ত্রী-বিধায়কদের স্ত্রীর সম্পত্তি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে, অথচ সাধারণ গরিব মানুষকে গত ১০ বছরে মোটে ১০,০০০ টাকা, অর্থাৎ বছরে ১,০০০ টাকা, মাসে ৮৩ টাকা, আর দিনে মাত্র ৩ টাকা দেওয়া হয়েছে। দিনে মাত্র ৩ টাকার সমপরিমাণ প্রকল্পের টাকা দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টাকে তিনি তীব্র নিন্দা জানান।

তিনি আরও বলেন, অসমের প্রায় ৮ লক্ষ খিলঞ্জিয়া মানুষ আজও ভূমিহীন, ফলে জমির পাট্টার জন্য তাদের হাহাকার করতে হচ্ছে। সরকার বসুন্ধরা প্রকল্পের মাধ্যমে ১৮ লক্ষ আবেদন গ্রহণ করলেও মাত্র ১ লক্ষ ৮০ হাজার পরিবারকে পাট্টা দিয়ে বাকিদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।তাই তিনি ভূমিহীন খিলঞ্জিয়া মানুষকে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় এই অন্যায়ের কথা স্মরণে রাখতে আহ্বান জানান।শিল্পী জুবিন গার্গের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বসুমতারী বলেন, ৯ এপ্রিলের নির্বাচনের দিনটির সঙ্গে জুবিন গার্গের প্রিয় সংখ্যা ৯-এর একটি আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু সরকার শিল্পীকে ন্যায় দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই জনগণকে ভোটের মাধ্যমে এই অন্যায়ের জবাব দিতে হবে।তিনি অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী ন্যায় দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তদন্ত কেবলমাত্র প্রহসনে পরিণত হয়েছে।এছাড়া, মধ্য গুৱাহাটীর ২৬ বছর বয়সী প্রার্থী কুংকি চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিজেপির আইটি সেলের মাধ্যমে ভুয়া ভিডিও তৈরি করে আক্রমণ চালানোর ঘটনাকে তিনি তীব্র নিন্দা জানান। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, পবন খেড়া মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা ৫২,০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের জমি- সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগ সরকার এখনও খণ্ডন করতে পারেনি।শেষে তিনি জনগণকে আহ্বান জানান যে, রাজেন গোহাঁই, লুরীণজ্যোতি গগৈ, জগদীশ ভূঞার মতো প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত বিরোধী ঐক্যকে ভোট দিয়ে অসমকে বিজেপির অপশাসন থেকে মুক্ত করতে হবে।
@@@@
— এম. হাছিম আলী