ভারতের প্রতিবেশী কূটনীতিতে নতুন করে ভারসাম্য স্থাপন করা উচিত
লেখক: মোহাম্মদ বুরহানউদ্দিন কাসমী
সম্পাদক: ইস্টার্ন ক্রিসেন্ট, মুম্বাই
ভারত, বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বর্তমানে তার পররাষ্ট্রনীতির এক সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি বিশেষ কৌশলগত ও আবেগঘন গুরুত্ব বহন করে। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক এখন নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে—ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি থেকে সরে এসে জনগণকেন্দ্রিক, আন্তরিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পথে এগিয়ে যাওয়াই সময়ের দাবি।
শেখ হাসিনা ও তসলিমা নাসরিনের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য ও অব্যাহত সমর্থন বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে জনমতের প্রতি উপেক্ষা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের জনগণের অনুভূতি ও প্রত্যাশাকে অগ্রাহ্য করে পরিচালিত কূটনীতি দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে দুর্বল করে। একটি পরিণত আঞ্চলিক শক্তির উচিত শুধু সরকার নয়, বরং সীমান্তের ওপারের সাধারণ মানুষের হৃদয়ের সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন করা।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তারেক রহমান আগামী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন, এবং ভারতীয় নেতৃত্ব যথাযথভাবে এই গণরায়কে সম্মান জানিয়ে অভিনন্দন ও জানিয়েছে। এই পারস্পরিক স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ইতিবাচক ভিত্তি হতে পারে।
ভূগোল পরিবর্তন করা যায় না—দেশগুলো তাদের প্রতিবেশী বেছে নিতে পারে না। তবে তারা সম্পর্কের ভাষা, ভঙ্গি ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপের নীতি, এবং যৌথ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভবিষ্যতের ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নির্মিত হওয়া উচিত।
ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হবে যদি সে চারপাশে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অব্যাহত উত্তেজনা দেশকে স্থায়ী সতর্কাবস্থায় রাখে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং আঞ্চলিক সংযোগ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হয়। অবিশ্বাস ও বিরূপতার পরিবেশে দেশের উন্নয়ন কখনও বিকশিত হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার প্রতিকূল অবস্থান—যার মধ্যে শুল্কযুদ্ধ, একতরফা বাণিজ্যনীতি এবং ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত—বিশ্ব রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। অপারেশন সিন্দুর চলাকালে পাকিস্তানের প্রতি তাঁর ঝোঁক, পরবর্তীতে বাংলাদেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক ও গার্মেন্টস বাণিজ্য চুক্তি—এসবই দেখায় যে বহিঃশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

তবুও সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আন্তরিকতা, সংযম এবং সম্মানজনক আচরণের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হতে পারে। আইপিএল খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক কিংবা আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বাংলাদেশ ও তার জনগণ সম্পর্কে অপরিণত মন্তব্য—এসব সহজেই এড়ানো যেত যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অকারণ টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।
আঞ্চলিক নেতৃত্ব কেবল শক্তি বা প্রভাব দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন হয় আস্থা, সহমর্মিতা এবং ধারাবাহিক ইতিবাচক পদক্ষেপের। ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ দেশগুলোর অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে বিশ্বে সম্মানিত—তার স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির জন্য। এই মর্যাদা রক্ষা করা শুধু ভারতের বৈশ্বিক অবস্থানের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।
সম্মান, বাস্তবতা ও পরিমিতিবোধের ওপর ভিত্তি করে পুনর্গঠিত প্রতিবেশী নীতি এখন আর বিকল্প নয়—এটি সময়ের অপরিহার্য কৌশলগত প্রয়োজন।