আপনার সবকিছু থাকবে, শুধু আপনি থাকবেন না
লেখক: জামিল আহমেদ কাসমি
শিক্ষক: মার্কাজুল মাআরিফ এডুকেশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার, মুম্বই।
মানুষ দুনিয়ায় আসে শূন্য হাতে, আবার একদিন শূন্য হাতেই চলে যায়। অথচ এই অল্প সময়ের জীবনে আমরা কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি সম্পদ, বাড়ি-ঘর, জমিজমা, পরিচিতি, সম্মান, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। মনে হয়, এসবই যেন চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু মৃত্যু এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সেই ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে দেয়।
একবার ভাবুন, আপনার মৃত্যুর পর আপনার গোসলের জন্য যে সাবানটি ব্যবহার করা হবে, সেটি আর কেউ ব্যবহার করবে না; ফেলে দেওয়া হবে। যে বিছানায় আপনার জীবনের শেষ মুহূর্ত কেটেছে, সেই বিছানার চাদর ও বালিশের কভারও হয়তো আপনার পরিবারের লোকেরা আর ব্যবহার করবে না। কিছু সময়ের মধ্যেই আপনাকে সেই ঘর থেকে বের করে দেওয়া হবে। যে ঘরটিকে আপনি নিজের বলে মনে করতেন, সেখানেই আপনার মরদেহ আর রাখা হবে না; বাইরে খাটিয়া বা চৌকিতে রাখা হবে।
এরপর শুরু হবে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার চারপাশে জড়ো হবে মানুষ। কেউ আপনাকে ভালোবেসে কাঁদবে, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, আবার কেউ হয়তো সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে জানাজায় অংশ নেবে। তারপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আপনার মরদেহ মাটির নিচে চলে যাবে।

আর আপনি?
আপনার সঙ্গে যাবে না আপনার বাড়ি, জমি, ব্যাংকের টাকা, ব্যবসা, গাড়ি, পোশাক কিংবা আপনার প্রিয় কোনো বস্তু। যাবে শুধু আপনার আমল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার স্মৃতিও মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকবে। প্রথম দিকে আপনাকে নিয়ে অনেক কথা হবে। পরিবার ও আত্মীয়রা আপনাকে স্মরণ করবে। কিছুদিন পর স্মরণ কমে আসবে। কয়েক বছর পর আপনার কথা খুব কম মানুষই বলবে। এক প্রজন্ম পেরিয়ে গেলে অনেকেই হয়তো জানবেই না আপনি কে ছিলেন। দুই প্রজন্ম পর আপনার কবরের চিহ্নটিও হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা নিজেরাই তো এমন কত কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, যাদের পরিচয় আমাদের জানা নেই। আমাদের পূর্বপুরুষদের কতজন কোথায় শুয়ে আছেন, আমরা তার হিসাবও জানি না। একশো বছর আগে এই জায়গায় কে বসবাস করতেন আমরা জানি না। এই সম্পদ কার ছিল জানি না। যে বাড়ি, জমি কিংবা সম্পদকে আজ আমরা নিজের বলে মনে করছি, একশো বছর পরে সেগুলো কার হবে তাও জানি না। তখন আমরা থাকব না; অন্য কেউ থাকবে, অন্য কেউ মালিকানা দাবি করবে, অন্য কেউ সেই সম্পদ নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবে।
তাহলে এই জীবন আসলে কী?
এ জীবন স্থায়ী ঠিকানা নয়; এটি একটি সাময়িক সফর। আমরা এখানে পরীক্ষার জন্য এসেছি। আমাদের পরিচয়, সম্পদ ও অবস্থান সবই সাময়িক। স্থায়ী হলো শুধু সেই আমল, যার হিসাব আমাদের একদিন আল্লাহর সামনে দিতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। সেই উদ্দেশ্য যেন আমরা দুনিয়ার ব্যস্ততা, সম্পদের মোহ ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দের মধ্যে ভুলে না যাই।
আজ আমরা যে জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত, একদিন সেই জীবনই শেষ হয়ে যাবে। আজ যে মানুষগুলো আমাদের চারপাশে, একদিন তাদের ছেড়ে আমাদের একাই চলে যেতে হবে। আজ যে সম্পদ নিয়ে এত চিন্তা, একদিন তা অন্যের হাতে চলে যাবে। তাই মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়াও জরুরি।
চলুন, আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি যদি আজই আমাদের পৃথিবীর জীবন শেষ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মতো কী আমল আমাদের আছে? মানুষের প্রশংসা কতটা পেলাম, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; আল্লাহ আমাদের ওপর কতটা সন্তুষ্ট সেটিই আসল বিষয়।

একদিন সবকিছু ছেড়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মহান রবের কাছেই, যাঁর কাছ থেকে আমরা এসেছি এবং যাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
আল্লাহ আমাদের দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে নেক আমল করার, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।