ভারত সরকার কি অ-ভারতীয়দেরও পাসপোর্ট ইস্যু করে?

Eastern
5 Min Read
27 Views
5 Min Read

ভারত সরকার কি অ-ভারতীয়দেরও পাসপোর্ট ইস্যু করে?

লেখক: মোহাম্মদ বুরহানুদ্দিন কাসমি
সম্পাদক, ইস্টার্ন ক্রিসেন্ট, মুম্বাই

২৪ জুন ২০২৬ তারিখে, যা ১৪তম পাসপোর্ট সেবা দিবস ছিলো, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) কর্তৃক প্রদত্ত এই বক্তব্য যে ভারতীয় পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়—নাগরিকদের মধ্যে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এমন একটি অবস্থান অযৌক্তিক, বিভ্রান্তিকর এবং ভারত সরকারের জারি করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারত সরকার কি অ-ভারতীয়দেরও পাসপোর্ট ইস্যু করে?
পাসপোর্ট কোনো সাধারণ কাগজ নয়। এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কর্তৃক কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর জারি করা একটি সরকারি নথি। ভারতে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণপত্র, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত অনুমোদন ও ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) জমা দিতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটির উদ্দেশ্য হলো আবেদনকারীর পরিচয়, জাতীয়তা এবং ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্যতা নিশ্চিত করা।

প্রত্যেক ভারতীয় পাসপোর্টের বায়োডাটা পাতায় “Nationality” নামে একটি বাধ্যতামূলক ঘর থাকে, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে: INDIAN। তদুপরি, পাসপোর্টে ভারতের রাষ্ট্রপতির নামে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থাকে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয় যাতে পাসপোর্টধারীকে অবাধে চলাচল করতে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুরক্ষা প্রদান করা হয়। যদি পাসপোর্টধারীকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবেই স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তাহলে এই ঘোষণার অর্থ কী?

ভারতের নথি-ব্যবস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। আধার কার্ডকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয় না। একই কথা প্যান কার্ডের ক্ষেত্রেও বলা হয়। এমনকি ভোটার আইডি কার্ড, যা ভারতের নিবন্ধিত ভোটারদের দেওয়া হয়, সেটিকেও প্রায়শই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। যদি এই সমস্ত নথিই অপর্যাপ্ত হয় এবং এখন পাসপোর্ট সম্পর্কেও বলা হয় যে এটি নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা করে না, তাহলে নাগরিকদের এই প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত যে—ভারতে নাগরিকত্বের প্রকৃত প্রমাণ আসলে কী?

Ajmal Perfumes
Advertisement


এই বিষয়টি শুধু আইনি নয়; এটি একটি বাস্তবিক সমস্যাও। সারা বিশ্বে পাসপোর্টকে একজন ব্যক্তির জাতীয়তার প্রধান প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সরকার, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, বিমান সংস্থা, দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এই উদ্দেশ্যেই পাসপোর্টের ওপর নির্ভর করে। এর বিপরীত দাবি করা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমানে ভ্রমণ-স্বাধীনতার দিক থেকে ভারতীয় পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বে প্রায় ৭৫তম। এ ক্ষেত্রে চীন, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কাসহ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ভারতীয় পাসপোর্টের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি এবং এর আন্তর্জাতিক মর্যাদা উন্নত করার পরিবর্তে, এর গুরুত্বকে খাটো করে এমন বক্তব্য অনিচ্ছাকৃতভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্যকে দুর্বল করতে পারে।

অবশ্যই আইনজ্ঞরা যুক্তি দিতে পারেন যে নাগরিকত্ব ভারতের সংবিধান, নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ এবং সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পাসপোর্ট নাগরিকত্বের উৎস নয়। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্য সঠিক। তবে, নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে অর্জিত হয়—এ কথা বলা এবং পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়—এ কথা বলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি একটি আইনগত তত্ত্ব, আর দ্বিতীয়টি এমন একটি নথি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যা সরকার কেবল তখনই ইস্যু করে যখন তারা নিশ্চিত হয় যে আবেদনকারী একজন ভারতীয় নাগরিক। যদি ভারতীয় নাগরিক হওয়া পাসপোর্ট পাওয়ার পূর্বশর্ত হয়, তাহলে পাসপোর্ট কীভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না?
একইভাবে, যখন শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিকদের ভোট দেওয়ার এবং নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রয়েছে, তখন ভোটার আইডি কার্ডকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার যুক্তি কী?

Advertisement


অতএব, সরকারের উচিত তাদের অবস্থান স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যাখ্যা করা। যদি ভারতীয় পাসপোর্ট ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তাহলে কি ভারত সরকার সাধারণ পাসপোর্ট অ-ভারতীয়দেরও ইস্যু করে? যদি তা না হয়, তাহলে নাগরিকদের কেন বিশ্বাস করতে বলা হবে যে শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ইস্যুকৃত একটি নথি, যেখানে স্পষ্টভাবে “Nationality: Indian” লেখা রয়েছে, সেটি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?

একটি গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা আস্থা বৃদ্ধি করে, আর অস্পষ্টতা সন্দেহের জন্ম দেয়। নাগরিকরা তাদের নিজেদের সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নামে জারি করা নথিগুলোর মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রাখেন। নির্বাচন কমিশন অব ইন্ডিয়া (ECI) কর্তৃক ইস্যুকৃত ভোটার আইডি এবং সম্পূর্ণ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ইস্যু করা একটি পাসপোর্ট—এই দুটিকে একজন ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হওয়ার প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

Share This Article
3টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Trending News

রবি 4 محرم 1447AH 29-6-2025AD

ধন্যবাদ, বিহার! মোহাম্মদ বুরহানউদ্দিন কাসমি সম্পাদক: ইস্টার্ন ক্রিসেন্ট, মুম্বাই আজ, ২৯শে জুন…

Eastern

ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন ২০২৫-এ কিছু সংশোধনী নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী

ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন ২০২৫-এ কিছু সংশোধনী নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী লেখক: মোহাম্মদ…

Eastern

ডিজিটাল ইউয়ানের নীরব উত্থান ও মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অবসান

ডিজিটাল ইউয়ানের নীরব উত্থান ও মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অবসান লেখক: মোহাম্মদ বুরহানউদ্দীন…

Eastern

দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আইনি পদক্ষেপের ডাক মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের

দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও আইনি পদক্ষেপের ডাক মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের EC…

Eastern

ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৫: এক সাংবিধানিক বিপর্যয়, তবে মুসলিম নেতৃত্ব নিরাশ করেনি

ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৫: এক সাংবিধানিক বিপর্যয়, তবে মুসলিম নেতৃত্ব নিরাশ করেনি…

Eastern

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের জীবনাবসান

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের জীবনাবসান EC News Desk দিল্লি ২৬-১২-২০২৪, ভারতের…

Eastern

Quick LInks

ECI-এর ভুলের জন্য সাধারণ ভারতীয় নাগরিকরা কেন অধিকার হারাবেন?

ECI-এর ভুলের জন্য সাধারণ ভারতীয় নাগরিকরা কেন অধিকার হারাবেন? লেখক: মোহাম্মদ বুরহানুদ্দিন…

Eastern

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের ওপর আরও একটি বড় আঘাত

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের ওপর আরও একটি বড় আঘাত লেখক: মোহাম্মদ বুরহানুদ্দিন কাসমি…

Eastern

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের ওপর আরও একটি বড় আঘাত

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের ওপর আরও একটি বড় আঘাত লেখক: মোহাম্মদ বুরহানুদ্দিন কাসমি…

Eastern