মহররম: ইসলামী নববর্ষের সূচনা, মর্যাদা, করণীয় ও বর্জনীয়
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মহররম মাসের প্রকৃত শিক্ষা
জামিল আহমেদ কাসমী
ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হলো মহররম। এই মাসের মাধ্যমেই নতুন হিজরি বছরের সূচনা হয়। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক জীবনে মহররম একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকেই এই মাসকে শুধুমাত্র কারবালার ঘটনাকেন্দ্রিক শোকের মাস হিসেবে বিবেচনা করেন, অথচ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় বর্ণিত এর স্বতন্ত্র মর্যাদা, ফযীলত ও শিক্ষা সম্পর্কে অবগত নন।
মহররম আমাদেরকে নতুন বছরের শুরুতে আত্মসমালোচনা, তাওবা, আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন এবং নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর আহ্বান জানায়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ মাসের প্রকৃত মর্যাদা অনুধাবন করা এবং শরিয়তসম্মত আমলের মাধ্যমে এর বরকত অর্জনের চেষ্টা করা।
মহররম: পরিচয় ও তাৎপর্য
“মহররম” শব্দের অর্থ হলো—সম্মানিত, মর্যাদাপূর্ণ ও নিষিদ্ধ। জাহিলী যুগেও আরবরা এই মাসকে সম্মান করত এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকত।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ … مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ
“নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৩৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই চারটি সম্মানিত মাসের ব্যাখ্যা করে বলেন: “বছর বারো মাসের। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। তিনটি ধারাবাহিক—যিলকদ, যিলহজ্জ ও মহররম; আর একটি হলো রজব।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৬৬২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৭৯)
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, মহররম সাধারণ কোনো মাস নয়; বরং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত মাসসমূহের অন্যতম।

মহররম মাসের মর্যাদা ও ফযীলত
মহররমের বিশেষ মর্যাদা বোঝাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এটিকে “শাহরুল্লাহ” (আল্লাহর মাস) বলে অভিহিত করেছেন।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ
“তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারয (ফরয) সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত (সালাত/নামাজ/নামায) হচ্ছে রাতের সালাত।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬৩)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে ফরজ রোযার পর নফল রোযার মধ্যে মহররমের রোযা সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ।
মুফাসসিরগণ বলেন, সব সময়েই গুনাহ নিষিদ্ধ; তবে সম্মানিত মাসসমূহে গুনাহের ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়। একইভাবে নেক আমলের মর্যাদা ও সওয়াবও অধিক হয়।
আশূরার দিনের গুরুত্ব ও ফযীলত
মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম, যা ইয়াওমে আশূরা নামে পরিচিত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
“আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশূরার দিনের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২)
এখানে উদ্দেশ্য হলো সগীরা (ছোট) গুনাহসমূহের ক্ষমা। কবীরা গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই আন্তরিক তাওবা করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও নির্দেশ দিয়েছেন: “যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে নবম তারিখও রোযা রাখব।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৩৪)
তাই সুন্নাহ হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোযা রাখা।
কারবালা, ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও শোক পালনের বিধান
মহররম মাসের একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো কারবালার প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতী যুবকদের নেতা ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাত। তাঁর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়। একজন মুমিন তাঁর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দোয়া পোষণ করবে। তবে কুরআন ও সুন্নাহ কোথাও মহররমকে স্থায়ী শোকের মাসে পরিণত করার শিক্ষা দেয়নি। ইসলাম ধৈর্য, দোয়া, ইস্তিগফার এবং শহীদদের জন্য রহমতের প্রার্থনা করতে শিক্ষা দেয়; কিন্তু আত্মপ্রহার, বিলাপ, মাতম, বুক চাপড়ানো কিংবা শরীর রক্তাক্ত করার মতো কাজকে সমর্থন করে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
“আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যারা (মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশে) গন্ডে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে এবং জাহিলী যুগের মত চিৎকার দেয়, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১২৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৩)
আরও বর্ণিত হয়েছে: أَنَا بَرِيءٌ مِمَّنْ حَلَقَ وَصَلَقَ وَخَرَقَ
“আমি তার সাথে সম্পর্কহীন, যে মাথার চুল ছিঁড়ে, উচ্চস্বরে বিলাপ করে এবং কাপড় ছিঁড়ে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১২৯৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৪)
অতএব, ‘হায় হুসাইন’ বলে বিলাপ করা, বুক চাপড়ানো, কালো পোশাককে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা, শরীর আঘাত করে রক্তাক্ত করা কিংবা শোককে ইবাদতের রূপ দেওয়া ইসলামী শরিয়তে বৈধ নয়।

সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে সঠিক অবস্থান
ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ। তবে তাঁদের ভালোবাসার নামে কোনো সাহাবীকে গালমন্দ করা বা তাঁদের সম্পর্কে কু-ধারণা পোষণ করা গুরুতর অপরাধ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي
“আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৪০)
মহররম মাসে করণীয়
১. আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
২. নতুন হিজরি বছরের শুরুতে আত্মসমালোচনা করা।
৩. বেশি বেশি নফল রোযা রাখা, বিশেষত ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম।
৪. কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দোয়ায় মনোনিবেশ করা।
৫. নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
৬. ইমাম হুসাইন (রাঃ) ও সকল শহীদের জন্য দোয়া করা।
মহররম মাসে বর্জনীয়
মাতম, বিলাপ ও বুক চাপড়ানো।
শরীর আঘাত করে রক্তাক্ত করা।
সাহাবায়ে কেরামকে গালমন্দ করা।
ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত কারবালা-কেন্দ্রিক কাহিনী প্রচার করা।
শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া।
সম্মানিত মাসের মর্যাদা নষ্ট করে গুনাহে লিপ্ত হওয়া।
নতুন হিজরি বছরের সূচনায় আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হোক—গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালিত করা। মহররমের প্রকৃত শিক্ষা শোক নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মহররম মাসের মর্যাদা যথাযথভাবে উপলব্ধি করার, সুন্নাহসম্মত আমল করার এবং সকল প্রকার বিদআত ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন!